গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ মাসুদ রানাকে ঘিরে দুর্নীতি, টেন্ডার বাণিজ্য, ভুয়া বিল-ভাউচার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ লুটপাট, পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া, আত্মীয়ের প্রতিষ্ঠানে কার্যাদেশ এবং প্রাক্কলন কারসাজির অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরেই তিনি আলোচনায়। এবার তাঁর নতুন কর্মস্থল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রায় ৩০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক।
২৭তম বিসিএস (গণপূর্ত ক্যাডার) কর্মকর্তা মাসুদ রানা শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-৩, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে দেড় শতাধিক ওটিএম টেন্ডার আইডি ঘিরে অনিয়মের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট ঠিকাদারি সিন্ডিকেটকে কাজ পাইয়ে দিতে দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট এনেক্স ভবনের রঙকরণের ১০৩৫৯৮৯ নম্বর টেন্ডারে যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে নিজের ভাগ্নিজামাইয়ের মালিকানাধীন ‘হোসেন এন্টারপ্রাইজ’কে কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া এনবিআর ভবনের সংস্কারকাজে সাড়ে ৯ কোটি টাকা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেট্রোফিটিং ও সড়ক সংস্কারে ১৮ কোটি টাকার প্রকল্পে প্রাক্কলন কারসাজি করে প্রায় ৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে হাইকোর্ট, বিসিএস প্রশাসন একাডেমি, মুগদা হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রকল্পে ভুয়া বিল-ভাউচার এবং কন্টিনজেন্সি খাতের অর্থ অপব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। ২০১৯ সালে এনবিআর ভবনের গুদাম থেকে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার নির্মাণসামগ্রী ও বৈদ্যুতিক ক্যাবল লোপাটের অভিযোগও তাঁর দায়িত্বকালকে ঘিরে সামনে এসেছে।
মাসুদ রানা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে রাজধানীর অভিজাত এলাকায় বিপুল সম্পদ থাকার অভিযোগ রয়েছে। তালিকায় রয়েছে গুলশানে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, বনশ্রীর ডি-ব্লকে প্রায় ৮ কোটি টাকা মূল্যের পাঁচতলা বাড়ি, এফ-ব্লকের মোল্লা ম্যানশনে স্ত্রীর নামে দুটি ফ্ল্যাট, বসুন্ধরা সিটিতে দুটি দোকান এবং মোহাম্মদপুরের বাবর রোডে ১০ কাঠার প্লট, যার সম্ভাব্য মূল্য ১০ কোটি টাকার বেশি। এ ছাড়া ঢাকা ও পাবনায় নিজের এবং আত্মীয়স্বজনের নামে আরও সম্পদ থাকার অভিযোগ রয়েছে।
অতীতের অভিযোগের নিষ্পত্তি না হওয়ার মধ্যেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রায় ৩০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পে তাঁর নতুন দায়িত্ব ঘিরে ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের তৎপরতার অভিযোগ উঠেছে।
মাসুদ রানার বিরুদ্ধে কথিত ৫ কোটি টাকার ভুয়া বিল, দেড় শতাধিক টেন্ডার আইডি, সরকারি প্রকল্পে ব্যয় কারসাজি এবং শতকোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি। তাঁর সম্পদ বিবরণী, আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব, জমি-ফ্ল্যাটের দলিল, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন এবং প্রকল্পভিত্তিক বিল-ভাউচার দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
সরকারি অর্থে পরিচালিত উন্নয়ন প্রকল্প কোনো কর্মকর্তা কিংবা ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের ব্যক্তিগত সম্পদ গড়ার মাধ্যম হতে পারে না। ঢাকা মেডিকেলের ৩০০ কোটি টাকার প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অতীতের অভিযোগগুলোর নথিভিত্তিক তদন্ত এবং সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এখন জনস্বার্থের দাবি।
অভিযুক্ত প্রকৌশলী মোঃ মাসুদ রানা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে চাইলে তারা কোন মন্তব্য করেননি।